"রসুন চাষ / Garlic cultivation"
রসুন বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য মসলা জাতীয় ফসল। এটি রান্নার স্বাদ, গন্ধ ও রুচি বৃদ্ধিতে অনেক বেশি ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন আচার ও মুখরোচক খাবার তৈরিতে রসুনের ব্যবহার রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি রসুন উৎপাদনকারী জেলা নাটোর। নাটোর জেলা বাংলাদেশের রসুনের চাহিদার শতকরা ৩০ ভাগ এবং একক জেলা হিসেবে শতকরা ৭০ ভাগ উৎপাদনকারী জেলা।
পুষ্টিমূল্য ও ভেষজ গুণঃ
রসুনে আমিষ, প্রচুর ক্যালসিয়াম ও সামান্য ভিটামিন ‘সি’ থাকে। রসুন
কৃমি নাশক, শ্বাস কষ্ট কমায়, হজমে সহায়তা করে, প্রস্রাবের বেগ বাড়ায়, শ্বাসনালীর মিউকাস
বের করে দেয়, এ্যাজমা রোগীর উপশম দেয়, হাইপারটেনশন কমায়, চুল পাকানো কমায়, শরীরে কোলেস্টেরল
লেভেল কমায়।
উপযুক্ত জমি ও মাটিঃ
পানি জমে না এমন উর্বর দো-আঁশ মাটিতে রসুন ভাল জন্মে তবে এঁটেল দো-আঁশ মাটিতেও চাষ করা যায়। জৈব
পদার্থ সমৃদ্ধ ও সহজেই গুঁড়ো হয় এমন মাটি রসুনের উপযোগী।
জাত পরিচিতিঃ
বারি রসুন-১, বারি রসুন-২, বাউ রসুন-১, বাউ রসুন-২, ইটালী (দেশী জাত), আউশী (দেশী জাত) ইত্যাদি।
বীজ বপনঃ
শুকনো রসুনের বাহিরের সারির কোয়া লাগানো হয়। ১৫ সে.মি. দূরত্বে সারি করে ১০ সে.মি. দূরে ৩-৪ সে.মি. গভীরে রসুনের কোয়া লাগানো হয়। প্রতি বিঘা
৪০-৪৫ কেজি রসুনের বীজ
প্রয়োজন
হয়।
সার ব্যবস্থাপনাঃ
সারের পরিমানঃ বিঘা প্রতি ৩৩ শতকে
ইউরিয়া ৩০ কেজি
টিএসপি ৩৩ কেজি
পটাশ ৪০ কেজি
জিপসাম ২৫ কেজি
বোরন ১.৫০ কেজি
জিংক ১ কেজি (আলাদাভাবে)
সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ
সম্পূর্ণ গোবর+টিএসপি+জিপসাম+বোরন+জিংক (আলাদাভাবে) ও অর্ধেক ইউরিয়া ও পটাশ সার জমি তৈরির শেষ চাষে প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ও পটাশ সার দুই কিস্তিতে ২৫ দিন বয়সে ও ৫০ দিন বয়সে প্রয়োগ করতে হবে। রসুন আবাদে ৩ বছর পরপর শতকে ৪ কেজি ডলোচুন এক চাষ দিয়ে ছিটিয়ে দিয়ে ১২-১৪ দিন পরে সব ধরনের রাসায়নিক সার দিয়ে ২৪ ঘন্টা পরে রসুন রোপন করবেন।
এছাড়াও রসুনের জমিতে ছাই প্রয়োগ করলে মাটি আলগা থাকে ও ফলন বেশি হয়।
সেচ ব্যবস্থাপনাঃ
মাটিতে রসের অভাব থাকলে মাঝে মাঝে সেচ দিতে হবে। প্রতিবার সেচ দেয়ার পর মাটি নিড়ানি দিয়ে কুপিয়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হবে। আগাছা দেখা দিলে তা পরিষ্কার করতে হবে।
রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনাঃ
পোকার নামঃ থ্রিপস
এ পোকা ছোট কিন্তু পাতার রস চুষে খায় বিধায় গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে। সে কারনে ক্ষেতের মধ্যে পাতা বিবর্ণ দেখালে কাছে গিয়ে মনোযোগ সহকারে দেখা উচিৎ, তা না হলে ফলন অনেক কমে যাবে।
রোগের লক্ষণ: এরা রস চুষে খায় বলে আক্রান্ত পাতা রূপালী রং ধারণ করে। আক্রান্ত পাতায় বাদামী দাগ বা ফোঁটা দেখা যায়। অধিক আক্রমণে পাতা শুকিয়ে যায় ও ঢলে পড়ে। রাইজোম আকারে ছোট ও বিকৃত হয়।
পোকা চেনার উপায়: পোকা আকৃতিতে খুব ছোট। স্ত্রী পোকা সরু, হলুদাভ। পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ গাঢ় বাদামী। বাচ্চা সাদা বা হলুদ। এদের পিঠের উপর লম্বা দাগ থাকে।:
ব্যবস্থাপনাঃ সাদা রংয়ের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার। ক্ষেতে মাকড়সার সংখ্যা বৃদ্ধি করে এ পোকা দমন করা যায়। আক্রমণ বেশি হলে সাইপারমেক্সিন গ্রুপের সাইপেরিন, সাইপার অথবা ইমাডিক্লোরো ফিড গ্রুপের এডমায়ার প্রতি লিটারে ১ মিলি সাইপারমেক্সিন অথবা ইমিডা ক্লোরোফিড প্রতি লিটারে ০.৫ মিলি গাছে ৪ থেকে ৫ দিন পরপর স্প্রে করতে হবে।
রোগের নামঃ কান্ড পঁচা
স্কেলরোসিয়াম রলফসি ও ফিউজারিয়াম নামক ছত্রাক দ্ধারা এ রোগ হয়। যে কোন বয়সে গাছ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। কন্দ ও শিকড়ে এর আক্রমণ দেখা যায়।
রোগের লক্ষণ: আক্রান্ত গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় ও ঢলে পড়ে। টান দিলে আক্রান্ত গাছ খুব সহজে মাটি থেকে কন্দসহ উঠে আসে। আক্রান্ত স্থানে সাদা সাদা ছত্রাক এবং বাদামী বর্ণের গোলাকার ছত্রাক গুটিকা (স্কেলরোসিয়াম) দেখা যায়। অধিক তাপ ও আর্দ্রতা পূর্ণ মাটিতে এ রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ক্ষেতে সেচ দিলেও এ রোগ বৃদ্ধি পায়।
ব্যবস্থাপনাঃ আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংশ করতে হবে। মাটি সব সময় স্যাঁত স্যাঁতে রাখা যাবে না। আক্রান্ত জমিতে প্রতি বছর পেঁয়াজ /রসুন চাষ করা যাবে না। ম্যানকোজেব গ্রুপের এগ্রিজে ডাইথেনএম-৪৫ অথবা ব্যাভিষ্টিন (কার্ববোন্ডাজিম) ছত্রাকনাশক প্রতি কেজি বীজে ১০০ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধণ করে বপন করতে হবে।
ফসল সংগ্রহঃ
রসুন গাছের পাতা শুকিয়ে বাদামী রং ধারণ করলে ঢলে পড়ে তখন রসুন তোলার উপযোগী হয়। গাছসহ রসুন তোলা হয় এবং ঐ ভাবে ছায়াতে ভালভাবে শুকিয়ে মরা পাতা কেটে সংরক্ষণ করা হয়।
No comments