পুরো নাম: ইউসুফ ইবনে আইয়ুব ইবনে শাদি (আরবি: يوسف بن أيوب بن شاذي), উপাধি: সালাহ আদ-দ্বিন (ধর্মের রক্ষক)।
প্রাথমিক জীবন ও ক্ষমতার উত্থান
জন্ম ও পরিবার:
সালাউদ্দিন ১১৩৭ বা ১১৩৮ সালে আধুনিক ইরাকের তিকরিত শহরে এক কুর্দি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নাজমুদ্দিন আইয়ুব এবং চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহ ছিলেন জেনগি সুলতান নুরুদ্দিন জঙ্গির বিশ্বস্ত সেনাপতি। সালাউদ্দিনের জন্মের পরেই তাঁর পরিবার তিকরিত ছেড়ে দামেস্কে চলে যায়, যেখানে তিনি বেড়ে ওঠেন।
নুরুদ্দিন জঙ্গির অধীনে:
সালাউদ্দিন দামেস্কে ধর্ম, বিজ্ঞান, গণিত এবং সামরিক কৌশল বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন। যুবক বয়সে তিনি তাঁর চাচা শিরকুহের সাথে নুরুদ্দিন জঙ্গির সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। চাচা শিরকুহের নেতৃত্বে তিনি মিশরে ফাতেমীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল সামরিক অভিযানে অংশ নেন। এই অভিযানগুলো তাঁর সামরিক প্রতিভা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী বিকাশে সহায়তা করে।
মিশরের উজির:
১১৬৯ সালে তাঁর চাচা শিরকুহ মিশরের উজির (প্রধান মন্ত্রী) নিযুক্ত হন, কিন্তু মাত্র দুই মাস পরেই তিনি মারা যান। তখন ফাতিমীয় খলিফা আল-আদিদ তরুণ সালাউদ্দিনকে মিশরের উজির হিসেবে নিয়োগ দেন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
মিশর ও সিরিয়ার শাসক
ক্ষমতা সংহতকরণ:
মিশরের উজির হওয়ার পর সালাউদ্দিন দ্রুত নিজের ক্ষমতা সংহত করেন। তিনি মিশরে সুন্নি ইসলামের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১১৭১ সালে শিয়া ফাতিমীয় খিলাফতের অবসান ঘটান। তিনি মিশরের শাসক হিসেবে আব্বাসীয় খলিফার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।
সাম্রাজ্য বিস্তার:
১১৭৪ সালে তাঁর পৃষ্ঠপোষক নুরুদ্দিন জঙ্গি মারা গেলে মুসলিম বিশ্বে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। এই সুযোগে সালাউদ্দিন সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ এবং ইয়েমেনের মতো অঞ্চলগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। এভাবে তিনি বিচ্ছিন্ন মুসলিম শক্তিগুলোকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন, যা ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল।
ক্রুসেড ও জেরুজালেম বিজয়
হাত্তিনের যুদ্ধ (Battle of Hattin):
সালাউদ্দিনের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে তাঁর বিজয়। ১১৮৭ সালের ৪ জুলাই তিনি গালীল সাগরের কাছে হাত্তিনের প্রান্তরে ক্রুসেডারদের সম্মিলিত বাহিনীকে এক নির্ণায়ক যুদ্ধে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে তিনি ক্রুসেডারদের পানি ও রসদের সরবরাহ বন্ধ করে দেন এবং তাদের একটি ফাঁদে ফেলে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেন। জেরুজালেমের রাজা গাই ডি লুসিনানসহ বহু ক্রুসেডার নেতাকে এই যুদ্ধে বন্দী করা হয়।
জেরুজালেম পুনরুদ্ধার:
হাত্তিনের যুদ্ধের পর ক্রুসেডারদের দুর্গগুলো একে একে সালাউদ্দিনের দখলে আসতে থাকে। অবশেষে, ১১৮৭ সালের ২ অক্টোবর, তিনি প্রায় ৮৮ বছর পর ক্রুসেডারদের হাত থেকে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন।
জেরুজালেম বিজয়ের সময় তাঁর দেখানো মহানুভবতা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১০৯৯ সালে ক্রুসেডাররা যখন জেরুজালেম দখল করেছিল, তখন তারা শহরের মুসলিম ও ইহুদি বাসিন্দাদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল। কিন্তু সালাউদ্দিন এর প্রতিশোধ না নিয়ে শহরের খ্রিস্টানদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। যারা মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল, তাদের অনেককে তিনি ক্ষমা করে দেন এবং নিজের অর্থ দিয়ে মুক্ত করেন।
তৃতীয় ক্রুসেড ও রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট
জেরুজালেমের পতনের খবর ইউরোপে পৌঁছালে পোপ তৃতীয় ক্রুসেডের ডাক দেন। এই ক্রুসেডে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজারা অংশ নেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট (Richard the Lionheart) ।
সালাউদ্দিন এবং রিচার্ডের মধ্যে তীব্র লড়াই হয়, বিশেষ করে আক্কা (Acre) অবরোধের সময়। দুজনের মধ্যে শত্রুতা থাকলেও একে অপরের প্রতি এক ধরনের সম্মান ও শ্রদ্ধা ছিল। কথিত আছে, একবার রিচার্ড অসুস্থ হয়ে পড়লে সালাউদ্দিন তাঁর জন্য ফল ও বরফ পাঠিয়েছিলেন এবং নিজের ব্যক্তিগত চিকিৎসককে তাঁর সেবার জন্য প্রেরণ করেছিলেন।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১১৯২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে রামলার চুক্তি (Treaty of Ramla) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে:
➡️জেরুজালেম মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।
➡️খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীরা নিরস্ত্র অবস্থায় জেরুজালেম ভ্রমণ করতে পারবে।
➡️উপকূলীয় কিছু শহর ক্রুসেডারদের অধীনে থাকবে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও উত্তরাধিকার
সালাউদ্দিন কেবল একজন দক্ষ সেনাপতিই ছিলেন না, বরং একজন ন্যায়পরায়ণ ও দানশীল শাসক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী নিম্নরূপ:
✅ধার্মিকতা: তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম ছিলেন এবং ইসলামের নীতি কঠোরভাবে মেনে চলতেন।
✅উদারতা: তিনি এত বেশি দান করতেন যে মৃত্যুর সময় তাঁর ব্যক্তিগত কোষাগারে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
✅ন্যায়বিচার: তিনি শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি ন্যায়বিচার করতেন।
✅ক্ষমা ও মহানুভবতা: জেরুজালেম বিজয়ের সময় তাঁর দেখানো ক্ষমাশীলতা এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
✅সামরিক প্রজ্ঞা: তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ রণকৌশলী, যা হাত্তিনের যুদ্ধে প্রমাণিত হয়।
মৃত্যু
তৃতীয় ক্রুসেড শেষ হওয়ার কয়েক মাস পর, ১১৯৩ সালের ৪ মার্চ, সালাউদ্দিন দামেস্কে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের পাশে একটি সমাধিতে দাফন করা হয়, যা আজও দর্শনার্থীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক স্থান।
উপসংহার
সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, বীরত্ব এবং ন্যায়বিচারের এক চিরন্তন প্রতীক। তাঁর জীবন ও কর্ম কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ন্যায় ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর কিংবদন্তি আজও মানুষের মনে অনুপ্রেরণা জোগায়।
No comments