Header Ads

Header ADS

পর্ব ২: উন্নত জাত নির্বাচন, বীজ ও বীজতলা প্রস্তুতি

একটি সফল আমন ধান চাষের জন্য সঠিক জাত নির্বাচন এবং মানসম্মত বীজ প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভালো জাতের বীজ সঠিক পদ্ধতিতে প্রস্তুত করে রোপণ করলে ফলন অনেক বেশি হয়।


আমন ধানের প্রচলিত ও উচ্চ ফলনশীল জাতসমূহ

বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের উচ্চ ফলনশীল (উফশী) আমন ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা কৃষকদের কাছে জনপ্রিয়। প্রতিটি জাতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে:

ব্রি ধান৪৯:
* মাঝারি জীবনকালের জনপ্রিয় একটি উফশী জাত।
* ফলন তুলনামূলকভাবে বেশি (প্রায় ৫.৫-৬.০ টন/হেক্টর)।
* কিছুটা খরা সহনশীলতা রয়েছে।
* অনেক কৃষক এই জাতকে পছন্দ করেন এর নির্ভরযোগ্য ফলনের জন্য।

ব্রি ধান৭৫:
* তুলনামূলকভাবে নতুন এবং উচ্চ ফলনশীল জাত।
* মাঝারি আকারের ধান, সরু ও সুগন্ধযুক্ত চালের জন্য পরিচিত।
* বিশেষত অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে এর ফলন ভালো হয়।
* ফলন প্রায় ৬.০-৬.৫ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান৮৭:
* উচ্চ ফলনশীল এবং আধুনিক জাতগুলোর মধ্যে অন্যতম।
* লম্বা ও চিকন দানার জন্য এর চালের চাহিদা বেশি।
* এই জাতের জীবনকাল তুলনামূলকভাবে কম।
* ফলন প্রায় ৬.৫-৭.০ টন/হেক্টর।

ব্রি ধান৯০:
* এটিও একটি উচ্চ ফলনশীল আধুনিক জাত।
* এর চাল সরু, সাদা এবং উন্নত মানের।
* রোগবালাই সহনশীলতাও ভালো।
* ফলন ৭.০ টন/হেক্টর পর্যন্ত হতে পারে।

বিনা ধান৭:
* বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BINA) কর্তৃক উদ্ভাবিত জাত।
* ঠান্ডা সহনশীল হওয়ায় দেরিতে রোপণের জন্য উপযোগী।
* কিছুটা লবণাক্ততা সহনশীল।
* ফলন ভালো এবং চাল মাঝারি মোটা।

কোন অঞ্চলের জন্য কোন জাত উপযোগী:
🔹 উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি: ব্রি ধান৪৯, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮৭, ব্রি ধান৯০।
🔹 নিচু ও জলমগ্ন এলাকা: জলমগ্ন সহনশীল জাত যেমন: ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৭৯, ব্রি ধান৯১ (বিশেষ ক্ষেত্রে)।
🔹 লবণাক্ত এলাকা: বিনা ধান৭, ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১।
🔹 খরাপ্রবণ এলাকা: ব্রি ধান৬৬, ব্রি ধান৭১, বিনা ধান১৯।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্থানীয় কার্যালয় থেকে আপনার অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত জাত সম্পর্কে পরামর্শ নিতে পারেন।

ভালো বীজ চেনার উপায়

একটি সফল ফলনের জন্য ভালো বীজ নির্বাচন অপরিহার্য। ভালো বীজের কিছু বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:

➡️ পুষ্ট ও পরিষ্কার: বীজগুলো সুগঠিত, পুষ্ট এবং ভাঙা বা রোগাক্রান্ত মুক্ত হবে। কোনো প্রকার আগাছার বীজ বা কণা থাকবে না।
➡️ সতেজ ও স্বাস্থ্যবান: বীজের রং স্বাভাবিক থাকবে এবং কোনো কালো দাগ বা বিবর্ণতা থাকবে না।
➡️ শতকরা অঙ্কুরোদগম হার বেশি: বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কমপক্ষে ৮০% হওয়া উচিত। এর অর্থ হলো ১০০টি বীজের মধ্যে কমপক্ষে ৮০টি অঙ্কুরিত হবে।
➡️ জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন: নিশ্চিত করুন যে বীজগুলো সরকার অনুমোদিত উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং প্যাকেটের গায়ে সীলমোহর ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ আছে।

বীজ শোধন ও অঙ্কুরোদগমের পদ্ধতি

বীজ শোধন রোগমুক্ত চারা উৎপাদনে সহায়ক এবং অঙ্কুরোদগম সঠিক করার জন্য বীজ জাগ দেওয়া জরুরি।

১. বীজ শোধন (রোগমুক্তকরণ):
* পদ্ধতি: প্রতি কেজি বীজের জন্য ২-৩ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম (যেমন: ব্যাভিস্টিন) বা ভিটাভ্যাক্স-২০০ নামক ছত্রাকনাশক মিশিয়ে বীজগুলো ভালো করে মেখে নিন।
* উদ্দেশ্য: বীজবাহিত রোগজীবাণু (যেমন: ব্লাস্ট, ব্রাউন স্পট) দমন করা এবং চারাগুলোকে সুস্থ রাখা।
* সময়: বীজ জাগ দেওয়ার আগে এই কাজটি করতে হবে।

২. বীজ জাগ দেওয়া ও অঙ্কুরোদগম (গজানো):
* প্রথম ধাপ (ভিজিয়ে রাখা):
* শোধন করা বীজগুলো একটি পাত্রে পরিষ্কার পানিতে ১২-২৪ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন।
* লক্ষ্য রাখবেন, পুরো বীজ যেন পানির নিচে থাকে।
* এই প্রক্রিয়ায় বীজ পানি শোষণ করে অঙ্কুরোদগমের জন্য প্রস্তুত হয়।
* দ্বিতীয় ধাপ (বীজ জাগ দেওয়া):
* ভিজানো বীজগুলো পানি থেকে তুলে একটি ভেজা চটের বস্তায় বা পাটের বস্তায় ভালোভাবে মুড়িয়ে রাখুন।
* বস্তাটি এমন জায়গায় রাখুন যেখানে বাতাস চলাচল করে এবং তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে।
* মাঝে মাঝে বস্তার ওপর অল্প অল্প পানি ছিটিয়ে দিন যাতে আর্দ্রতা বজায় থাকে।
* ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করবে, অর্থাৎ সাদা সাদা অঙ্কুর বের হবে।
* লক্ষ্য: যখন বীজের অঙ্কুরগুলো ধানের সমান বা সামান্য বড় হবে, তখন বীজতলায় ফেলার জন্য প্রস্তুত।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
🔹 অঙ্কুরিত বীজগুলো সঙ্গে সঙ্গে বীজতলায় ফেলে দিতে হবে। দেরি করলে অঙ্কুরগুলো বেশি বড় হয়ে যেতে পারে, যা রোপণের সময় চারার ক্ষতি করতে পারে।

বীজতলা তৈরির নিয়মাবলী

আমন ধানের জন্য সাধারণত দুই ধরনের বীজতলা তৈরি করা হয়: শুষ্ক বীজতলা ও ভেজা বীজতলা।

➡️ শুষ্ক বীজতলা (উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমির জন্য):
* জমি নির্বাচন: এমন জমি নির্বাচন করুন যেখানে বৃষ্টির পানি জমে না এবং রোদ পড়ে।
* প্রস্তুতি: জমিকে ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিন। ছোট ছোট বেড (১০-১৫ সেমি উঁচু, ১ মিটার চওড়া) তৈরি করুন।
* সার প্রয়োগ: বীজতলায় অল্প পরিমাণে পচা গোবর বা কম্পোস্ট সার ব্যবহার করলে চারার বৃদ্ধি ভালো হয়।
* বীজ বপন: তৈরি করা বেডের ওপর অঙ্কুরিত বীজগুলো সমানভাবে ছিটিয়ে দিন। এরপর হালকা করে মাটি বা ছাই দিয়ে ঢেকে দিন।
* পরিচর্যা: বীজ বপনের পর হালকা সেচ দিন। চারা গজানোর পর নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করুন।

➡️ ভেজা বীজতলা (নিচু বা মাঝারি নিচু জমির জন্য):
* জমি নির্বাচন: নিচু জমি যেখানে বৃষ্টির পানি সহজে জমে থাকে, এমন স্থান নির্বাচন করুন।
* প্রস্তুতি: জমিকে কর্দমাক্ত করে ভালোভাবে মই দিয়ে সমান করে নিন। ছোট ছোট প্লট বা বেড তৈরি করুন।
* সার প্রয়োগ: শুষ্ক বীজতলার মতোই অল্প পরিমাণে গোবর সার বা ইউরিয়া (খুব সামান্য) ব্যবহার করতে পারেন।
* বীজ বপন: কাদা জমিতে অঙ্কুরিত বীজগুলো সমানভাবে ছিটিয়ে দিন।
* পানি ব্যবস্থাপনা: বীজ বপনের পর প্রথমে হালকা পানি রাখুন, চারা গজানোর পর ধীরে ধীরে পানির উচ্চতা বাড়াতে পারেন, তবে চারা যেন ডুবে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
* পরিচর্যা: আগাছা দেখা দিলে সাবধানে পরিষ্কার করুন।

চারা তোলার উপযুক্ত সময়:
🔹 সাধারণত ২০-৩০ দিনের চারা রোপণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। এর বেশি পুরনো চারা রোপণ করলে ফলন কম হতে পারে।

এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে আপনি সুস্থ ও সবল চারা তৈরি করতে পারবেন, যা আপনার আমন ধানের উচ্চ ফলনের ভিত্তি স্থাপন করবে।


পরবর্তী পর্বে আলোচনা করা হবে: জমি তৈরি ও রোপণ কৌশল।

No comments

Powered by Blogger.