Header Ads

Header ADS

পোস্ট ২৬: নবজাতকের জন্ডিস: কেন হয় এবং কখন চিন্তার কারণ?

নবজাতকের জন্ডিস: সাধারণ সমস্যা নাকি চিন্তার কারণ? জানুন সবকিছু

সুপ্রিয় নতুন মা-বাবা, আমাদের "গর্ভবতী মা ও শিশু স্বাস্থ্য" ব্লগের আজকের পর্বে আপনাদের সবাইকে স্বাগত। নতুন শিশুকে নিয়ে ঘরে ফেরার পর তার ত্বকে বা চোখে হালকা হলুদ আভা দেখলে যেকোনো বাবা-মায়েরই চিন্তা হওয়া স্বাভাবিক। এই অবস্থাকেই আমরা নবজাতকের জন্ডিস বলি।

খুশির খবর হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একটি সাধারণ এবং সাময়িক অবস্থা, যা নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে কখন এটি চিন্তার কারণ হতে পারে, তা জানা অত্যন্ত জরুরি। আজ আমরা নবজাতকের জন্ডিস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।



🔹 জন্ডিস কী এবং কেন হয়?

জন্ডিস কোনো রোগ নয়, বরং একটি লক্ষণ। রক্তে বিলিরুবিন (Bilirubin) নামক একটি হলুদ রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে ত্বক, নখ এবং চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যায়।

নবজাতকদের জন্ডিস হওয়ার কারণ:
➡️ অতিরিক্ত লোহিত রক্তকণিকা: গর্ভে থাকাকালীন শিশুর শরীরে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লোহিত রক্তকণিকা থাকে। জন্মের পর এই অতিরিক্ত কণিকাগুলো ভাঙতে শুরু করে এবং বিলিরুবিন তৈরি হয়।
➡️ অপরিণত যকৃত (Liver): নবজাতকের যকৃত বা লিভার পুরোপুরি কর্মক্ষম হতে কিছুটা সময় নেয়। তাই এটি রক্ত থেকে অতিরিক্ত বিলিরুবিন দ্রুত সরাতে পারে না।
➡️ স্বল্প বুকের দুধ পান: প্রথমদিকে শিশু কম দুধ পেলে তার মল ও প্রস্রাব কম হয়, ফলে শরীর থেকে বিলিরুবিন ঠিকমতো বের হতে পারে না।

✅ দুই ধরনের জন্ডিস: স্বাভাবিক ও রোগজনিত

  1. ফিজিওলজিক্যাল জন্ডিস (স্বাভাবিক জন্ডিস):
    এটিই সবচেয়ে সাধারণ। সাধারণত শিশুর জন্মের ২-৩ দিন পর এটি দেখা দেয়, ৪-৫ দিনের মাথায় সবচেয়ে বেশি হয় এবং ১-২ সপ্তাহের মধ্যে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ঠিক হয়ে যায়।

  2. প্যাথলজিক্যাল জন্ডিস (রোগজনিত জন্ডিস):
    এটি কিছু নির্দিষ্ট কারণে হয়, যেমন—মা ও শিশুর রক্তের গ্রুপের অমিল (Rh incompatibility), ইনফেকশন, লিভারের সমস্যা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

🏥 কখন জন্ডিস চিন্তার কারণ? চিকিৎসকের কাছে যাবেন কখন?

সাধারণত জন্ডিস ক্ষতিকর নয়, তবে বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেশি বেড়ে গেলে তা শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে পারে। তাই নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে এক মুহূর্ত দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন:

✅ শিশুর জন্মের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জন্ডিস দেখা দিলে।
✅ শিশুর ত্বক খুব বেশি হলুদ বা কমলা রঙ ধারণ করলে।
✅ হলদে ভাব যদি শিশুর হাত বা পায়ের তালু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
✅ শিশু খুবই নিস্তেজ হয়ে পড়লে বা তাকে ঘুম থেকে জাগানো কঠিন হলে।
✅ শিশু ঠিকমতো বুকের দুধ খেতে না চাইলে।
✅ শিশুর কান্না যদি খুব তীক্ষ্ণ বা তীক্ষ্ণ স্বরের হয়।
✅ জন্ডিস যদি ২-৩ সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়।
✅ শিশুর মলের রঙ যদি ফ্যাকাশে বা সাদাটে হয় এবং প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ হয়।

➡️ জন্ডিসের চিকিৎসা ও করণীয়

➡️ বারবার বুকের দুধ খাওয়ানো: এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শিশু যত বেশি দুধ খাবে, তত বেশি মল-মূত্র ত্যাগ করবে এবং শরীর থেকে বিলিরুবিন তত দ্রুত বেরিয়ে যাবে। প্রতি ২-৩ ঘণ্টা পর পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান।
➡️ ফটোথেরাপি (Phototherapy): যদি বিলিরুবিনের মাত্রা বেশি থাকে, তবে চিকিৎসক শিশুকে একটি বিশেষ নীল আলোর নিচে রাখার পরামর্শ দেন। এই আলো বিলিরুবিনকে ভেঙে দেয়, যা শরীর থেকে সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। এটি একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা।

🚫 কিছু ভুল ধারণা ও যা করবেন না

➡️ শিশুকে রোদে দেওয়া: অনেকেই শিশুকে সকালের হালকা রোদে দেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু বর্তমানে চিকিৎসকেরা এটি করতে নিষেধ করেন। কারণ, এতে শিশুর ত্বকের ক্ষতি বা পানিশূন্যতা হতে পারে। ফটোথেরাপির আলো অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ।

➡️ বুকের দুধ বন্ধ করা: কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করবেন না।

➡️ পানি, চিনির পানি বা মধু দেওয়া: নবজাতককে প্রথম ৬ মাস বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছুই দেবেন না। এতে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি।

শেষ কথা:
নবজাতকের জন্ডিস খুবই সাধারণ একটি বিষয়, তাই অহেতুক আতঙ্কিত হবেন না। তবে এর লক্ষণগুলোর ওপর সতর্ক নজর রাখুন। আপনার যেকোনো সন্দেহে বা চিন্তায় আপনার শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলুন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই আপনার শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করবে।

আগামী পর্বে আমরা আলোচনা করব শিশুদের আর একটি সাধারণ সমস্যা নিয়ে—"পেটে গ্যাস ও কলিক: শিশুর কান্না থামানোর উপায়"। আমাদের সাথেই থাকুন!

No comments

Powered by Blogger.